আমার ব্লগ তালিকা

বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

কবিতা

শাপলা পর্ব -৬


কবি মঞ্জীর বাগ এর কবিতা-






১।।  ∆ হরিণ ∆

 

ওরা ছুটে ছুটে আসে
নিভৃত বনের ভেতর সবুজ দিনান্তের আলো।
 শিং যেন বৃক্ষ ঘুমন্ত রৈখিক সরলতা
মোহ মাখা চোখে ওরা দেখে
ওরা ছুটে ছুটে ঢুকে পড়ে দেরাজের কোণে
দানাশস্যের শিশি কিংবা মসলার বনে
নিভৃত বিচরণ চালের ড্রাম কিম্বা আটার কৌটো
অপছন্দ নয়
ওরা ছুটে ছুটে আসে
ভেজানো সাবানের বাক্স মেজে রাখা  বাসনের 
স্তূপে
তীর বেগে ছুটে যায় মায়াবী স্রোত
গৃহস্থ কাজের ফাঁকে কবিতার মতন।





২।।  ∆ জ্যোৎস্না রমনী ও সাইকেল ∆



রূপনারায়ন ভাসে
ভাসে, অমোঘ ভাঙা চাঁদ জ্যোৎস্নার জলে
সবুজ অন্ধকার একা এবং একা গুটিসুটি
চাঁদ ও জ‍্যোৎস্নার নিবিড় কথকতা আঁকে রাগ
অর্থে নিভৃত অনুরাগ,বিব্রত সময় 
অসময় অভিসারে

অভিসার কথাটির আগে কোনো বৈষ্ণব গোঁসাই
রাধা নামটি যোগ করেন তবে বাজে নিভৃত মঞ্জীর
চাঁদ বেয়ে নেমে আসে ঠোট,,গাছের চাঁদ মাখা পাতায়
অলীক খুনসুটি;আহা চাঁদ এসো
ওই দেখো মনিরুলের সাইকেল ঘর

গাঙচিল শেষ ডানাটি ঝাপটিয়ে উড়ে গেছে
সন্ধ্যার পূর্বের গানে।গান আহা মোহময় প্রকাশ
নীল জ্যোৎস্নায় পড়ে গেছে দোকানের ঝাঁপ

টায়ার স্পোক নাটবল্টু টাইট দিতে
 সোনালী জোনাকী হয়ে ওঠে কবি
ব্যাক লাইট এখন অনন্তের অন্তর ছুঁয়ে
একটু ঘুম দিতে পারো

এরপর তীব্র ক্লাইম্যাক্স
মাঝরাতে নেমে আসে পরী
ডানা  তার কালো রাতচাদর
এখন সে গৃহ এবং নারী

সে উড়ে এলেই রূপনারায়ন ধুয়ে দেয়
মনিরুলের ধুলোমাখা হাত,এখন তার হাতে কলম
কলম ছুঁয়ে সে এক হাতে সে জড়িয়ে থাকে পরী
আলতা মাখা পা পায়ে পায়ে ছুঁয়ে যায়
চাঁদ আর কোজাগরী পূর্ণিমার আলপনা




৩।।  ∆ নির্বাচিত কবিতা ∆



রাত্রির মাঠে খেলাধুলা হলে
চেটে খায় দুরন্ত কুমির
পারিজাত ফুলের গল্প শুনিয়ে নিয়ে এলো এক দুরন্ত নাবিক
এক বনে যেখানে শুয়ে আছে অতীত কঙ্কাল
অপাপবিদ্ধ কুমারী যেন পুষ্পপাত্র ভরে দেয় অন্তর্জাত  গান
চতুরদংশক ডেকে দেয় যুগান্তের পাপ
জলে চাঁদ ভেসে বেড়ায় সেও জলের গভীর 
এ গভীরে লুকিয়ে আছে অনিবার্য মৃত্যু
শব্দের এক জাদু মহিমা আছে
জাদু জানে সেই জাদুকর।সেই করে সম্মোহন
 শব্দের মালা গেঁথে গুন করে বাণ
 কখনো সেই বাণে অষ্টাদশী চাঁদ চিতা হয়ে ভাসে
দেবী অন্নপূর্ণার একান্ত ভাতের হাড়িতে ফোটে কালো কাঁকর
 নির্বাচিত কবিতার পাতায় পাতায় ভাসে অজস্র সুঘ্রাণ।





৪।।   ∆ ব্লক ∆



পরিযায়ী হাওয়ার সাথে উড়ন্ত দুপুর 
মেয়ে পুরুষেরদল আধরঙা খুচরো 
বিষন্ন বিস্তার আধুলীতে বেঁধে রাজধানীর 
পারাপার ঘাট
 স্যাটেলাইটীয় চোখে দেখে যায়
 টেলিভিশনের জমায়েত।

দুঃখের অনাদি গান লিখবে বলে যে অমিয়বালক
এখানে ওখানে ভুলভাল ঘোরাঘুরি করে,
সে ঠিক
আমারই মতো বেকুব উজবুক, 
কত ভুল করছি
জীবনে হেসে অবহেলায় তার গুনতি সেরে ফেলি
মা লক্ষীর কুনকে কম পড়ে 

তুমি খুব গুছিয়ে  হিসাব করো অনুদিদি, কবির ওয়ালেট
আমার কেবল পেঁজা পেজাঁ জল ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মতন
একবার যদি দেখে নিতে মিতালী পুরান, তবে আমরা দুজন মিতে অম্লশূল সই

সর্ষের ক্ষেতে ছবি আঁকে হলুদপাখি গান
পরিয়ায়ী শব্দের ভারে কেঁপে যায় বুক

একটি পরিযায়ী পাখিকে মেয়ে বন্ধু বলে ডেকেছিল
সামাজিকতার লাল রেখা আঁকা যায়নি বলে 
গুঁড়োগুড়ো দেড়দিনের সাজানো  সাংসার

সাংসার সাজাবে  হাঁড়িকুড়ি বাসনীয় গান
আমার আর কবিতার মাঝে ঘুমিয়ে আছে 
আমাদের  মেয়ে পরিজাত ঘোর স্বপ্ন প্যাস্টেল

নির্জন পৃথিবীর  পথে এখন লগডাউন। সবটাই ব্লগ
প্রতি সকালের মাদকতা জল।টাইমলাইন দেখি কবিতা ভাইরাস।

আতঙ্কে থাকি উন্মাদিনী রাই ডুবে যাই যদি কোলাজ  রঙ জল
তার চেয়ে ব্লক করে দিই কবিতার প্রোফাইল 

অনুদিদি,   আমি ডুবে যাচ্ছি গভীর গভীরে
ভয় করছে আমার

দিদিভাই; তোমায় কি এ বার ডাকা যায়





৫।।   ∆ মা নদী ও গান ∆



নদীর জলের চলাচলে যে গান লেখা থাকে
তার সফল সঙ্গতে মিশে থাকে আর্য রমনীর 
বেদগান ঋত্বিকহোমাগ্নি বেদ মন্ত্র ধ্বনি। সিন্ধু এক
 নদীরনাম নয়;সিন্ধু একটি সভ্যতা। এইসভ্যতার নাগরিক গানে আমি স্নানাগার কিংবা শস্য ঘর
আমাকে এইভাবে আঁকা যায় যেন
ধ্বংস স্তুুপ থেকে পাওয়া নিসুতো রমণীয় গান
গান বলতে মোহময় সুর যদি বলো তবে  আমি যোগ্য সঙ্গত।
 নদীর জলের সাথে ভেসে ভেসে হয়ত এখন
আমার ভিতর জন্ম নেবে ধান গান।এখন আমি মাটি।মাটি ভিতর ঘুমিয়ে থাকে যে আস্পৃহা
বীজ হয়ে অঙ্কুরোদ্গমের কথা লিপি।
লিপিলেখা ছিল আলতামিরার গুহায়।এক তীব্র বাইসন নতুন প্রস্তর  যুগের শিকার লিখেছিল

শিকার জীবনের সত্য। বাঁচার আকাঙ্ক্ষা য় কেউ 
শিকার হয় কেউ শিকার করে।
এসময় শিকার হয় অবোধ বধ্য নৈতিকতা র পীঠভূমি

নদীর তীরে বসে আছি।এখন জল স্বচ্ছ নেই আর।

স্বচ্ছতোয়া গঙ্গার শুদ্ধতা এখন পরিহাস
নদীকে শুদ্ধ কুমারী রূপে বয়ে যাওয়া..
ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের মতো দেখি

বসে আছি।হেরে যাওয়া স্বপ্ন জড়করে
এখন বাতাসে ভাসে  কটু ভেঙে যাওয়া ঘ্রান
চিতায় পোড়া চর্বি মাংসের গলেগলে পড়া
মরাকাঠ
তবু নদী পলিভরা বুকে শ্বাস গানের কথা বলে
তৃষিত জরায়ু ভরে যায় অমৃতবীজ

এসো জল;মা হই গান হই পৃথিবীর মতো

এদূষনের মধ্যে একটি চড়ুইয়ের বাসা এবং
আকাশের নীল রঙে নদীরজল মিশে
মধুবনী গ্রামের দেওয়ালে একটা নতুন
সভ্যতা বিনম্র ছবির মক্স আঁকে::
এমুহুর্ত আকেন্দ্রবিস্তার থেকে
 বীজের গর্ভধান গান 
 হোমাপাখির না ওড়া ডানায় আগুন ও বিদ্যুৎ 



অলংকরণ - পৌলমি দেবনাথ

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

কবিতা

শাপলা পর্ব -৬


কবি অরিন্দম প্রধান এর কবিতা-





১।।  ∆ বংশপুরুষ ∆



একটা ঘর এগিয়ে এল আমার দিকে
সর্বক্ষণ টর্চ দেখিয়ে গেল
ঘূর্ণি বাতাসে ফুলের পাঁপড়ি দুঃখ ভুলে
নৌকার পালে সাহস জোগায়
পাতা হাতে মা ভাতের অপেক্ষায়

একটা তালপাতার চাঁটাই দরকার

ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাবা
ঝুঁকে পড়া শরীরে সাজিয়ে দিলেন
এক পংক্তি দু পংক্তি...
পুরো ঘর জুড়ে শ্বাস-বায়ুর চলাচল

বাবা কান্ড হয়ে ধারণ করছেন আমাদের বংশপুরুষ...





২।।  ∆ শহর ∆



আলো নেভা দুর্দিনে কাঁপছে শহর
ছাদে শুকায় সস্তা ঘর-বাড়ি
কুমারী ছুটে ছুটে প্রান্তর কাঁপিয়ে এসে
নির্জন শাড়ি মেলে ধরে বুকে
বৈদ্যুতিক তারে ঘর-মোছা কাপড় ঝুলে

আশ্চর্য মানুষ তুই!

টিভি চ্যানেলে রঙবাতি জ্বলে

মেঘে মেঘে কথা হয়ে যায়
কালের সৌম্যরূপ ঢুকে পড়ে ঘরে
পথিকের চোখ নিভু নিভু

এহেন দিনে পাখি দুটি ধরা পড়ে।





৩।।  ∆ উঠোন ∆



নীচের দিকে তাকাই--একগুচ্ছ ধানের শীষ
রেখে গেছে মলিন বসন লক্ষ্মী
উৎসবের ধান
আলোছায়া রোদ জুড়ে বসে আছে উঠোন
ঠায় দাঁড়িয়ে লৌকিকতা

নীচুস্বরে বাতাস খুলে দেয় দরজা
দু-পা সিঁড়ি ও অনুভবে
উঠোন গোবরজল শুদ্ধ হল।





৪।।  ∆ জলতরঙ্গ ∆



চাঁদ এসে জলে পড়লে ফুঁপিয়ে উঠে তল
আমি খড়কুটো হয়ে ভাসতে থাকি
পূর্ণিমার জলে

এতো হাসাহাসি জলের মধ্যে ভালো দেখায় না

কত স্বর নেমে আসে স্পর্শ, কমা, কোলনে
আকাশের মেঘ ভয় পেয়ে লুকিয়ে রাখে চাঁদ

পূর্ণিমা বন্দর বদলায়
নিস্তেজ জলে চলে আমরন অনশন।




৫।।  ∆ মায়া কাক ∆



অন্ধ সময় বৌদ্ধগুহা ভেদ করে
ভেঙে ফেলে মানবিক দেওয়াল

মাটির শব্দে চাপা পড়ে প্রতিমা-চোখ
ঝড়ের বাসায় পালক উড়ে আসে

রঙের প্রলেপে ডানা ভারী হয়
সময়ের সাথে মায়ায় আবিষ্ট সূর্যদেব

রাত্রি ভেবে শিস দেয় একে অপরকে
মায়া কাক ও মেয়ে কাক




ক্যামেরা বন্দি - পৌলমি দেবনাথ

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবিতা

শাপলা পর্ব -৬


কবি প্রাণনাথ শেঠ এর কবিতা-






১।।  ∆ আলো ∆



চারিদিকে ছড়ানো মণিমুক্তো
বর্ণালি চোখে জড়িয়ে আছে আঁধার
পোয়াবারো ভয়েদের, পেতেছে জমাটি সংসার

এ বড় সুসময় আমাদের
সুরধাম ছেড়ে মরলোকে পথেঘাটে দেবতারা জমিয়েছে আসর
আঁধার-চোখে ঠাওর হচ্ছে না দানব না-কী ঈশ্বর

ভয়দের নিয়ে কথা হোক এবার
গায়ের রং, আকার আয়তন, গুণপনা-এইসব 
সব কোথায় কবে (কার আশিসে নাকি অভিশাপে)   ছিঁড়ে ছিল জন্মনাড়ি তার

এস বসি, খুঁজে দেখি অতীত বর্তমান
কালোয় না আলোয়- কোথায় অনায়াস বিচরণ
রাম জন আলি ভেদে কীভাবে বদলায় আবরণ।





২।।    ∆ অমরতা ∆



এতদিনে সম্বিত হল
উত্তুরে বাতাস দক্ষিণে যায়
ভীতরা ভয়ে দেখায় দাঁত নখ
সোজা হাঁটলে ডাইনে বাঁয়ে কোনদিকেই বাঁকে না পথ
এতদিনে সম্বিত হল
ভুলভাল জেনেছি কত
রোগ বিয়োগ গুণ ভাগ
 ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞানের ক্লাসিক্যাল তত্ত্ব

এতদিনে সম্বিত হল
আমি আমি করে বড়ো একা
ভুলেগেছি জল আলো মাটির এ দেশ
ফুল পাখি নদীর ভূবনডাঙা

এতদিনে সম্বিত হল
সঙ্গে যায় না কিছুই
হেজে যাওয়া ধন-সম্পত্তি টাকা-কড়ি
কেটে যাওয়া দাগ-ই শোনায় অমরতার বাণী।





৩।।    ∆  ঈশ্বরলিপি ∆



উচ্চকাঙ্খার সমানুপাতিক যুদ্ধ, সমান                                                         অনোন্যক জীবন
ইতিহাস সে কথা লেখেনি কখনো।

ভয়কে অনুবাদ করে ভূত ভগবান শয়তানের জন্ম
এই সত্য মানেনি শাস্ত্র।

বাতাসের অনির্দিষ্ট দিক, এই সহজ সত্য জানি না বলেই
দিকভ্রম হয়, গড়ি পূব-পশ্চিমের গল্প।

নামতে নামতে, ভাঙতে ভাঙতে অবিভাজ্য অবয়ব
স্বর্গ মর্ত্য পাতালের বানানো কাহিনি, পাপ- তাপের ঘেরাটোপে
কেউ ঈশ্বরমুখী কেউ ঘোরতর নাস্তিক।

রসেবশে মজে থাকি ফুল পাখি নদীর দেশে
ঈশ্বরের ঈশ্বর হওয়ার বাসনায় বাঁশ খড় মাটির পুত্তলি বানাই
বিসর্জণও দিই অবলীলায়
আর দিব্যি গড়গড়িয়ে চলে তাঁর জগৎ-সংসার।





৪।।   ∆ ঈশ্বরমতি ∆



একেই বলে খইভাজা কাজ
সবকিছু ফেলে, কালো চোখ আর কানা কান দিয়ে
সহজ ও কঠিন কাজের ফর্দ লিখি।

নীচে নামা সহজ
ভাঙা
অপমান করা
আরো সহজ খড়-মাটির দেবতা গড়া।

সোজা হয়ে দাঁড়ানো কঠিন
ঠিক পথে থাকা
ভুল স্বীকার
আরো কঠিন কালোকে কালো বলা।

তালিকা বানানো শেষ
ভয়রা অভিধানকে তালাক দিয়ে
পরে নেয় জমকালো পোশাক
আমাকে ভয় দেখায়।

থ মেরে দেখছে গাছ-গাছালি
ঘাম আর তপ্ত নিঃশ্বাস হারিয়ে
আমি ক্রমশ ঈশ্বরমুখী হয়ে উঠছি।





৫।‌।  ∆  ঝমঝম বৃষ্টি ও একটি রাত্রির গল্প ∆




যার ঘরদোর নেই সেই
মেঘ আর রোদের চাঁদোয়া খাটিয়ে মহল্লা বানায়
বাতাসের সঙ্গে ভাব জমায়, যে
সাত সমুদ্র পেরিয়ে তার জন্য বয়ে আনে রূপকথা।

সে রাত্রির নিস্তব্ধতায় অসংখ্য আলোকবিন্দুর                                                    ভিতর খুঁজে পায়
এক যুগ আগে মহানিস্ক্রমনে যাওয়া দুই                                                               অভিমানী তারা
যারা অণুক্ষণ তাকে চোখে চোখে রাখে।

সেই ছেলেটা জলকে জল বলে
ফুলের মালি
পাখির জন্য রোপন করে তারা, আর
পাহাড় কেটে কেটে হতে চায় ভগীরথ।

ইতিহাস ভূগোল আর পিথাগোরাসের সূত্র                                                ঠিকঠাক বোঝার আগে
সে হারিয়েছে দুই পরমধন।

খালি পা, দড়ি প্যান্টৈর শৈশব পেরিয়ে
ছায়াকে কায়ায় ধরে রাখার দিনে-কান্নারা
দলা পাকিয়ে উঠে আসে গলায়।

দূর আকাশের মমতাভরা আশিস জোছনা হয়ে
                                      সিক্ত করে আত্মজকে।




অলংকরণ - পৌলমি দেবনাথ

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবিতা

শাপলা পর্ব -৬


কবি সুদীপ্ত মাজি এর কবিতা-







১।।  ∆ চিত্রকল্প ∆




হাওয়া তাকে স্পর্শ করে, কখনও ঝাপট 
রৌদ্র দেয় শীতে তাপ, কখনও দহন 
জল তাকে আর্দ্র করে, কখনও সলিল-
                                    সমাধির মোক্ষে টানে 
                   কখনও বিবর 
কেবল দেখায় তাকে শূন্যপট... 
                     নৌকো-নেই-নদী 

ফুটো জাল কাঁধে একা চলেছে ধীবর! 






২।।  ∆ চৌর্যবৃত্তি ∆




তোমার দেরাজ থেকে 
সাদা পৃষ্ঠা চুরি করে আনি। 

অজস্র বকুলফুল ঝরেছিল, পূর্বজন্মে 
তুমি, মৃত্তিকার প্রসাধনে নিজেকে সাজিয়েছিলে 
                                       আজ মনে পড়ে। 

এনামেল করা নখ,তীক্ষ্ণ নখের স্পর্শ, শিহরণ 
ভুলে আজ ভাবতে থাকি, ভালবাসা খুব হলে 
                              সেপ্টিকের সম্ভাবনা বেশি। 
ভাবতে থাকি রক্ষিতের ভ্যারাইটিজ স্টোরে পাব 
               বোরোলীন,সুরভিত ক্যালেণ্ডুলা ক্রিম?

পলিত কেশের পাশে,তরুণেরা ইহপৃথিবীতে      নিজ বুকে এপিটাফ লেখে,শরীরে গজিয়ে ওঠে ঘাস ।

যাত্রাপথে পড়ে এই বধির বিষণ্ণ ভাঙা 
                                        প্রভাত-প্রদোষ। 
তবু মেঘ, অন্ধকার, কলঙ্কের কালো ভেঙে, 
                                           দু'হাতে সরিয়ে 
এই চৌর্যমনোবৃত্তি বেঁচে আছে বলে 
পতঙ্গের মরণোন্মুখতা নিয়ে পৃথিবীতে 
                                       এত গবেষণা! 

এই চৌর্যমনোবৃত্তি বেঁচে আছে বলে 
আমাদের জলযান আজও এত অলৌকিক 
                                           বলে মনে হয়।






৩।।  ∆ সারাংশ ∆




পাঁচটা-দশটা ফুটো পয়সার ঝনঝন আর
অ্যাসপিরিনের রুপো রাঙতায় 
ভরে যাওয়া লাল পলাশের দিন 

টিউশানি ড্রপ!  উদাস-পাগল 
পাখি উড়ে গেছে, শূন্য খাঁচাটি 
কাঠবেকারের হাল সঙ্গিন 

চপ্পলে আঁটা সেফটিপিন আর 
কামানো হয়নি দাড়ি -গোঁফ তার 
চায়ের দোকানে বেড়ে গেছে ঋণ 

'প্রেম' বিষয়ক গবেষণা এই 
সারসংক্ষেপে, হৃদজীবীগণ 
ছায়ায় দাঁড়িয়ে নোট করে নিন! 






৪।।  ∆ অপরাহ্ন ∆



শিশুতোষ সচিত্র বইয়ের মতন দিন। আর 
                         রঙে রঙে রাঙানো উষ্ণীষ 

আর কত ইচ্ছেপূরণের স্বপ্ন -- নন্দনকানন থেকে
                         নামা ইলশেগুড়ি 

আর কত বালুচরি মুগা ও রেশমকাজে 
                         ভরে থাকে স্মৃতি, তন্তুবায় 
নির্জন মাকুর দিকে হাত বাড়ায় ---- আর 

                               স্থবির রঘুডাকাত 
সাহসী ঝোপের মধ্যে ফেলে রাখা রণপা খুঁজে                                                                  যায়...





৫।।  ∆ সান্তালাবাড়ি ∆



জারুলের কাছে, অমলতাসের কাছে 
যেতে গিয়ে চেপে ধরছে ভয় 

           কেঁপে উঠছে চপ্পল 

ভয়ের ওপারে শিস্ দিচ্ছে দেখার রোমাঞ্চ 

তোমার মুখ থমকে যাওয়া নদীখাতের মতো... 



অলংকরণ - পৌলমি দেবনাথ

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

কবিতা

শাপলা পর্ব -৬


কবি সুবীর সরকার এর কবিতা-




১।।  ∆ সম্পর্ক ∆



যদি হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলি আবার ফিরে                                                            আসতো
ক্যারামের লাল গুটি খুঁজে দিতে বলতেন শৈলেন জ্যেঠু
আমি ভুলতে পারি না মেজদির মৃত্যুর দিন
মায়ের বরফশীতল কপালে কোনোদিন আর ঘাম জমবে না
পৃথিবীর সমস্ত মাঠে আমি ঘুঘুদের বসে থাকতে                                                              দেখি
ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক আসলে গুনগুন
                                                  গান
মামাবাড়ির উঠোন থেকে আমি কুড়িয়ে আনি
                                                 পুতুল
আমার দিকে এগিয়ে আসে কমলা রঙের   
                                              খরগোশ
লেডিকিলার হতে চাওয়া পুরুষের চওড়া
কাঁধে বসে থাকে ফড়িং
জীবনের ভেতর ঢুকে পড়তে থাকে অপমান
পাটবনের দিকে দৌড়ে পালানো শেয়ালেরা
এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দের নাম কাশফুল
পাখিরা ডানা ঝাড়ে।
 আমি যুক্তাক্ষর ও জলযানের কথা লিখি
মৃত বন্ধুদের জন্য আজও চোখ ভিজে যায়
আর রেডিওতে জন্মান্তরের গান বাজে





২।।   ∆ কলাবাগানে মার্কেজ ∆




কলাবাগিচায় মার্কেজ,হাতে হাভানা চুরুট
হেমন্তের রোদ মাখছে  পল গগার ডায়েরি
ওয়ারহীন বালিশ ও নীল মশারীর নিচে দিন
                                                      কাটে
দু'ধারে পতঙ্গের বন,পাখিরাও ডানা মেলে
                                                     ওড়ে
কতকিছু ঘটে চলে।ঘটনাক্রমের সাথে লীন
                                                হয়ে থাকি
চূড়ান্ত প্রেমিক হবো
ঠোঁটে ঠোঁটে শিস বাজবে
ফাঁকা মাঠে গড়িয়ে যাবে কত শত
                                       মার্বেল
ড্রামবাদক পিঠ ঠেকে নামিয়ে রাখছেন
                                                  ড্রাম
পেয়ালা থেকে চলকে যাওয়া চা
স্বপ্নে বারবার দেখি বেড়ালের থাবা
আর গোলকিপারহীন গোলপোষ্ট
কলাবাগানে মার্কেজ,হাতে হাভানা 
                                        চুরুট





৩।।   ∆ তথ্যচিত্র ∆



নদীকে তো নদীর জল দিয়েই চিনে নিতে হয়
একটা বাঁশি তো কিনে আনতে পারো অন্তত
                                            আমার জন্য
রিস্টওয়াচে বরফ জমলে 
আমরা প্ৰত্যবর্তনের গল্প বলা শুরু
                                           করি
পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষ গান গাইতে
                                                         পারে না
আমার কোলবালিশের ভেতর পাখি ঢুকে
                                                    পড়ে
আমার পাশবালিশের নিচে সুড়সুড়ি ঢুকে
                                              পড়ে
গোপন চিঠির গল্প আর শোনাবো না
তথ্যচিত্রে গুঁজে দেব ফেরিঘাট





৪।।  ∆ মায়াবন্দর ∆



তুই আলোর নিচে হাঁটবি
তুই হাওয়া জড়িয়ে হাঁটবি
পদযাত্রা শুরু হবে আর পদযাত্রা পৌঁছে যাবে
                                   ঘোকসাডাঙ্গার হাটে
আমি তখন নুতন করে সব সাজাচ্ছি
বাদামী রঙের ঘোড়ার সাথে হাডুডু 
                                           খেলছি
এই শহরে অনেক গোপন গুহা আছে
খসে পড়া পাতার গান
কপালের ভাঁজে জমে থাকা
                                    ঘাম
হরিণ ঢুকে পড়ছে পূর্ববঙ্গ কলোনির ভেতর
শুকিয়ে যাওয়া পুকুরে আমি সর্বাঙ্গ ডুবিয়ে
                                                 রাখি
ধনিবাড়ির ছবি থেকে ম্যাজিক নেমে আসছে
মায়া ও মমতা আসলে তো এক বন্দরের নাম
সারাজীবন আগ্রহ দেখালাম কফিন    
                                    বহনকারীদের জন্য
পিতলের কুঁজো থেকে এখন জল ঢালা হচ্ছে
দিগন্তে অনেক হাঁস
পাখিরা মুখস্থ করছে পিনকোড
বন্দুক পছন্দ করি না
বারুদ ভালোবাসি না
পিয়ানোর পাশে ফেলে আসি 
                                   রিস্টওয়াচ
কালো আলখাল্লার মত জীবন আমাদের
অথচ শ্যাওলার রং কিন্তু সবুজ নয়
অভিমানের কোনো প্রতিশব্দ হয় না
হাট ও মাঠের আড়াল থেকে আমরা হাততালি
                                        কুড়িয়ে অনি





৫।।  ∆ গান ∆



আমাদের জীবনে টুকরো মেঘের মত কিছু      
                                         ভরসন্ধ্যে আছে
আজকাল পায়ে পেরেক ফুটলেও আর ব্যাথা
                                                       পাই না
দু'চার মিনিট কথা বলা হয়ে গেলেই
উড়তে শেখা পাখিদের ব্যালাড শুনি
কিছু কি সত্যি হারায় মানুষের জীবনে!
নদীর পলিতে মৃদু পা রাখি
ভোরের বাতাসের গান অনন্ত গাড়িয়াল হয়ে
                                                      বাজে






অলংকরণ - পৌলমি দেবনাথ

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবিতা

শাপলা পর্ব -৬


কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় এর কবিতা-




১।।  ∆ সূচনা ∆



ঠিক কোনখান থেকে শুরু করা যায় 
এই পাথর খোলামকুচি নাকি ফুল-ফল 
এই নালা নর্দমা নাকি আকাশ পাতাল 
এই হাতাখুন্তি নাকি কবিতা গান 


চব্বিশ ঘন্টা ব্যাপী খুঁজেছি দিনের আলোয় 
চব্বিশ ঘন্টা ব্যাপী খুঁজেছি রাতের অন্ধকারে 
দিনের অন্ধকারও দেখেছি 
রাতের আলোও দেখেছি 
ঠিক কোনখান থেকে শুরু হয়েছে এই জল 
জল থেকে প্রবাহ আর প্রবাহ থেকে ঘুম 


ঘুম বলতে ঠিক কী বোঝায় 
হয়তো এই পাথর জানে কিংবা জানে পাখি কিংবা গান 






২ ।।  ∆ সত্য এবং অসত্য ∆



শব্দার্থ নিয়ে আমি লড়াই-এ মাতি না , শব্দকে ভালবাসি শুধু ।
শব্দের ভেতর ব্রহ্মা আছেন কী নেই এসব জ্ঞানের তৃষ্ণা 
জ্ঞানীদেরই থাকে শুধু , জল পান করে যারা শীতল হন না কোনোদিন । 

রঙ যাকে ছুঁয়ে থাকে তাকেই রঙিন বলে মানি , রঙেদের 
জাত গোত্র সন্ধানে নামি না।  রঞ্জন বা রঞ্জনাকে সমান বন্ধুত্ব দিয়ে 
নিজের বুকের মাঠ সবুজ পোশাকে ঢেকে সাজিয়ে নিয়েছি । 
আকাশে নক্ষত্রগুলি দিনরাত্রি ডাকে । 

স্বপ্নের ভেতর যার পেয়েছি সন্ধান কেবল অলীক বলে তাকে 
দূরে রাখিনি সরিয়ে , বিজ্ঞানীর মত তার সন্ধান করেছি 
গলাধঃকরণ আর আঙ্গিকরণের সাথে সাথে , ভবঘুরে বলে যারা 
তাচ্ছিল্য করেছে মানস প্রেমিক- পাখিদের তাদের জন্য আজও সুখবর 
দিতে পারছি জেনো , মানস মন্থন করে আতপ ভাতের গন্ধ 
বন্টন করার বিল পাখিদের সংসদে কাল অনুমতি পাবে । 

আলোর ভেতর আমরা স্বাধিকার পাই , অন্ধকারে পাই নিজ নিজ পরিচয় । 


 



 ৩ ।।  ∆  ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ∆



গভীর শালজঙ্গলের ভেতর প্রচ্ছন্ন এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ 
গাছের ডালে ডালে জড়িয়ে থাকা লতাগুলি মোটা হতে হতে 
পাইথন ঘুম ,তার নিচে ফাঁকে ফাঁকে স্টাফকোয়াটার্সের গায়ে 
সুগন্ধি সাবানের ফেনায় সূর্য ভেঙে রামধনু । চত্বরের মাঝ বরাবর 
যোগ চিহ্নটি চিত হয়ে শুয়ে ভাগ অঙ্কে সরবে নীরব , আর 
সেই যোগচিহ্ন বেয়ে পিঁপড়ে-মানুষেরা আলোর অন্ধকারে ঘুরপাক 
অবিরাম । মেয়ে-হস্টেলের পাশ দিয়ে এক বনবাসের রাস্তা 
যা ইন্টারনেটে ধরা পড়ে না । ছেলে-হস্টেলের চারধারে আছে 
বেশ কিছু গর্তপথ , ভাসপক্ষী বসে আছে ড্রাগ-যোনি পথে 
কলার উঁচানো অধ্যাপকরা ধাতু প্রস্তরে হাবুডুবু । তবু এই কলেজ 
ক্যাম্পাসের বেশ স্ফীত বক্ষে দুর্গাচালা অহরহ পাল্টে দিচ্ছে 
আলোর অর্থ অন্ধকারের সামর্থ্যকে । এইখানে 
আমগাছের নিচে এক গুমটি-ডাকঘরে বসে একজন অনুজ্জ্বল কবি 
অহরহ মেপে চলেছেন মানুষের রক্তচাপ, শর্করা ও 
হিমোগ্লোবিনের দৈনন্দিন ত্রাস-ব্যাকরণ  





  ৪ ।।  ∆ জলযীশু ∆



পাথরের জলপান চলে 
চরিত্র খোয়ার ভয় বিন্দুমাত্র থাকে না জলের 
সে জানে চরিত্র বলে নিজস্ব কিছু নেই তার 
অথবা যা আছে তাকে বিকৃত করে 
খিদে ছটফট বাঘেরও ক্ষমতা নেই 
সুতরাং পাথরকে স্তনদান 

স্তনপানে পাথরের মেদমজ্জা বাড়ে 
লৌকিক-সংসারধর্মে ভাষা পায় রঙ পায় অনাকৃতি পায় 
একদিন জলকেই সে গবেষণা করবে ঠিক করে 
ছোটো বড় পত্রিকায় জল নিয়ে প্রচুর প্রবন্ধ গান গল্প কবিতায় 
যা ইচ্ছা তাই লিখে চলে 
যা ইচ্ছা তা বুঝে নিয়ে কিছু লোক 
পাথরকে সংবর্ধনা দেয় 

জলকে যারা জল বলে চেনে 
তারাই কেবল জানে 
জলে আর যিশুখ্রিষ্টে পার্থক্য নেই 





৫ ।।  ∆ ঘাটশিলা ∆



সুবর্ণরেখার কাছে জল চেয়ে বিব্রত হয়েছি
জল নেই অশ্রু নেই উচ্ছ্বাস নেই আছে আর্তি শুধু
সোনার রেখার ছবি বদলে গেছে কার্বনের দাগে 
ধারাগিরি গিয়ে দেখি গিরি আছে ধারা নেই 
গাছেরা নির্বাক আর অনুজ্জ্বল স্থিরচিত্রে বাঁধা
বিভূতিভূষণ নেই চতুর্দিকে বিভূতি কেবল 
চায়ের দোকানে গিয়ে জল চাইলে কিনলের বোতল 
যে মেয়েটি জল দিত কিছুদিন আগে তার 
মৃত্যু হয়েছে বলে বোতল-জলেরা খুব দাপাচ্ছে এখন 
সামান্য জঙ্গল থেকে রাস্তার হাত ধরে পার হতে হতে 
দেখি একটি বালক একাই 
আনন্দে পাথর চেটে তৃষ্ণা মুক্ত নধর উদ্ভিদ 



অলংকরণ - অমৃতা নায়ক

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°



রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০

কবিতা

শাপলা পর্ব - ৫


কবি রাজেশ্বরী ষড়ংগী এর কবিতা-






১।।     • সনদ •

              

 

প্রতিটি সর্বনাম ছায়াবৎ ধ্বনি

   

কিছুই থাকেনা বাকি- নামমাত্র

        মৃত কথা, মন্ত্রপুষ্প, ছায়া ভাসে জলে


মাটির দাওয়ায় ওড়ে লতানো চড়ুই


হৃদয়ে বেঁধে রাখো তার       

         দু-একটি বকুল ফুলের আলো


তোমার সনদ পাঠাও মধ্য আষাঢ়ে


জানিনা কিভাবে এই মন্দার বাতাসে

        সর্বশেষ দ্রুতিটুকু ছুঁয়ে


             জন্মান্ধ ভ্রমরেরা ওড়ে   




২।।     • পরজন্ম •



দেখো প্রিয়,


 এ ঝড় উত্তরণের

 সামগান শ্যামাঙ্গী শষ্যের


করকুন্তলে ভরে দাও সকল আলো

     উচ্চারণে ভরে দাও প্রকোষ্ঠ আধার


শরীর থেকে ভেসে আসে জলের মন্ত্র, ক্ষমার আড়াল


বিদ্যুৎঘন এই মেঘ মোহনায়

 সমস্ত চুম্বনরাশি ঢেলে দাও আদিগন্তে

     

পরজন্মহীন এই আলোর জাহাজে




৩।।     • সমর্পন •



দেহকাল ধরে ফুটে আছে ফুল 


তার সমর্পণ কোথাও রাখিনি, 

উৎসর্গপত্রটুকু ছাড়া । 


মেঘের উপত্যকা নেমে এলে-

 দু'চোখে অন্ধকার খুলে বসি।

 ক্লান্তির পায়ে বাঁধা থাকে গতজন্মের কথা।


একটি মোহিতসুর ডেকে ওঠে বাঁশির আড়ালে। 




৪।।    • গন্ধ •

 

 নদীকে জানাই 

গাছ মাটি আর অশ্রুর কথা।


 নদী আমার পূর্বজন্মের আলো।


মায়ের শরীরের গন্ধ নিয়ে বয়ে যাচ্ছে 

জন্ম-জন্মান্তর

অবগাহনের সব ছাই ভেসে যাচ্ছে স্রোতে ও জলে।  



৫।।   • জীর্ণ ধুলোর দিন  •



জীর্ণ ধুলোর দিন শেষ হলে অনন্ত গ্রহণ বেঁধে চলে যাবো শিমুলের বনে।


অতল শূন্যকে

 শিল্পসম্মত খুন করে ফেলে গেছে যারা, 

তারাও, শিরায় শিরায় তীব্র অন্ধকার টেনে বেঁচে থাকে

নিমগ্ন বকের ঠোঁটে।


নাভিকুণ্ডের পাশে সুগন্ধী আলো জ্বেলে বসে আছি জ্বরা ও মৃত্যুর দিকে--


জীর্ণ ধুলোর দিন শেষ হলে, অনন্ত গ্রহণ বেঁধে চলে যাবো শিমুলের বনে। 



অলংকরণ - ইন্দ্রানী পন্ডা

""""""""""""""""""""""""""""”""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

কবিতা

শাপলা পর্ব-৫

কবি সেলিম মণ্ডল এর কবিতা-





১।।    ধান্দাবাজ
          °°°°°°°°°


অল্পপরিচিত তিনজনের সঙ্গে একদিন চায়ের দোকানে দেখা হল।
প্রথমজন জিজ্ঞাসা করল— তুমি কি হিন্দু?
আমি বললাম— হ্যাঁ।
দ্বিতীয়জন জিজ্ঞাসা করল—তুমি মুসলমান না?
আমি বললাম— হ্যাঁ।
তৃতীয়জন বলল— তুমি ধান্দাবাজ।
তারপর তিনজন একসঙ্গে উচ্চস্বরে বলল— ধান্দাবাজ, ধান্দাবাজ...
আমি নিজেকে ধন্যবাদ দিয়ে চারকাপ চায়ের বিল মিটিয়ে দিলাম




২।।     তুমি জানো না
           °°°°°°°°°°°°°


আমি কি বলেছি—  শরীরে পলাশ ফোটাও?
আমি কি বলেছি—  মরুভূমির মতো চিকচিক করো?
আমি কি বলেছি— ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ো?

আমি কি বলিনি— ধারালো দাঁতের একটা কুকুর দাও?
আমি কি বলিনি— ঘুমের ঘোরে তোমার বাঘ লেলিয়ে দাও?
আমি কি বলিনি— ঘরের ভিতর ছেড়ে দাও পোষা গোখরো?

আসলে সবই বলেছি
অথবা  কিছুই বলিনি

তবে কতবার যে কানের কাছে ঠোঁট ঘষে মরে গেছি!
তুমি জানো না...




৩।।     শাড়ি
          °°°°°


মনখারাপ ফেলে আসিনি
তোমার কাছে রেখে এসেছি কাঁটাতার

ভাগের ফসল মাঠে। পাখিদের করুণা তোমার ওই দুই ঠোঁট
কবেকার কোন জলজোনাকি
আলো ছড়িয়ে ডাঙায় রেখেছে প্রেম?

উড়ে উড়ে যায় দেশ... তোমার শাড়ি 
সারি সারি বক হয়ে মেঘের ভিতর ঢুকে যায়

আধখোলা 
             এলোমেলা
                           আধভেজা




৪।।     তিন অধ্যায় ২
          °°°°°°°°°°°°°°     
  

সংসারী মানুষ। নুনেভাতে আছে ভালোই
একবার বলেছিল: ভালো আছি, তুমিও ভালো থেকো।
এরপর বর্ষা এল। নতুন পাতায় সেজে উঠল ঘর।
মা হবে। শিশুর মুখে তুলে দেবে স্তন। ভোরের পাখিটি
গাছে গাছে সাজিয়ে দিচ্ছে চলে যাওয়া সেইসব দিনের আয়োজন!
ঘর হল অথচ পর হল না। মনে কি পড়ে আজও?
সুখীগৃহকোণের ছবি ফুটে ওঠে
ছবিতে-দোতারায়। তার অপরাধ স্বীকার করে। কিন্তু
শিকারে ছিল না কোনো মাছ! সব কাঁটা বেছে নিলে
আগ্রহ কমে। যা ফুটে যায়, সেই-ই ধারালো
ব্যথাই আসলে কলঙ্কময়…
কী চায় বুঝি না! শিরাতে লেগে থাকে নুন।
দাউ দাউ আগুন জ্বলে। ভাত হবে না। চাপিয়েই বসি থাকি।
ফুলে ওঠে শিরা। মলম সেই-ই দেয়। তবুও সে একা। অপেক্ষা তারও
আছে। শীতের কোনো রাতে আমরা মরে যাই। আবার একসঙ্গে বেঁচে উঠি
শীতেরই রাতে।



৫।।     পুজো
          °°°°°°


কার দুঃখ নেব? বাবা না মা?
দু-জনের দুঃখ মাথা চাপিয়ে দেখলাম খুব একটা ভারী নয়
আমার ছোট্ট মাথা
ঘন কালো চুল
দুঃখগুলো বরফের মতো মাথার ওপর 
মনে হচ্ছে, যেন শরতের শিউলি ফুটেছে
বাতাসে ভাসছে পুজোর গন্ধ 

আহা, মাটির প্রতিমা
এই বরফ নিয়ে কীভাবে পুজো দেব তোমায়?



অলংকরণ - শুভদীপ প্রধান

-------------------------------------------------------------------

কবিতা

শাপলা পর্ব - ৫

কবি অলক জানা এর কবিতা-






১।।      লাশচক্
            °°°°°°°


বিষাদের ঘোরেই আপাদমস্তক ব্যথা 
প্রতিটি সুন্দরের কাছে এখন নিরাপদ দূরত্বের চিঠি

কাব্য করার সময় না জানি আর ফিরবেনা
অজস্র পাতার অবাধ খসে পড়া, শুনশান রাস্তার মতো দিকে দিকে ন্যাড়া গাছের সারি ! 

একটা দুটো পাখির মতো নির্ভয় সতর্ক পুলিশ
বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে আরোগ্য, 
মহাজীবনের গান। 

লাশচক্ শিরোনামের জায়গা 
পৃথিবীতে একটিও নেই, 
প্রসূতি ভরসার মতো রূপকথার আদলে তৈরি
ঘোষিত ধর্মকাঁটায় বিকচ্ছে রঙ বেরঙের খবর। 

নির্দ্ধারিত সীমা কাটা শ্মশান দীর্ঘ জিহ্বায় দখল করছে রাজপথ থেকে সাগর, নিরপরাধ লাশের আজ কোন পাসপোর্ট ভিসার দরকার নেই।

রক্তনালিকায় প্রত্যাশারা, আকণ্ঠ বিপন্নতার ভেতর 
তারা খসার নিয়মে মরে পড়ছে ঠক ঠক, 

লাশচক্ শিরোনামের জায়গা এখন
আকণ্ঠ শরীর, নাকি মিথ্যে নিরাময় স্রোতে 
গা ভাসানো এক-পৃথিবী মানুষের মন ?




২।।      শেষপর্বের কয়েক পংক্তি
            °°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°


অধিকতর সভ্যতা চেয়েছে মানুষ
পেটভরলেই মন ভেজাতে বড়োবেশি উতলা

শরীরের নিয়মেই খাদ্যাভ্যাস
অতলস্পর্শের জন্য সোমরস আয়োজন ! 

চিবিয়ে খায় জ্যোৎস্না আর নিঃস্বতার চাঁদ, গড়াগড়ি একপাশে শ্মশানের আধেক পোড়া কাঠ 

প্রতিটি নিয়ম রেখায় ঝুলতে থাকে কিছু সমর্থন
প্রতিটি প্রতিবাদের আড়ালে থাকে সম্ভাবনার বীজ

পালটে যাচ্ছে সময় ও সময়ের ছবি
চোখের অভিযোজন চাই আর সহ্যের সাহস। 

মাটি সুন্দর আকাশ সুন্দর বলেছে----মানুষ
তিনি মহৎ সে মন্দ বলেছে-----মানুষ 
চারা পুঁতছে ফুল ছিঁড়ছে----মানুষ

শীতল উষ্ণ স্রোত পেরিয়ে ক্লান্ত বোধ 
একদিন বোবা হয়ে গেলে 
এভাবেই অনুবাদহীন পৃথিবী-পাথর, 
একা এবং নিশ্চিহ্ন মানুষ।




৩।।       মহাপৃথিবীর যাত্রী
             °°°°°°°°°°°°°°°°°


যদি সব ঠিক থাকে
আমাদের দেখা হবে।

প্রতি মুহূর্তে মরণ 
নির্ভরতার দেয়ালে ঝুলিয়ে দিচ্ছে 
শোকের ক্যালেন্ডার 

আলগা জোর আর 
ধনুকের মতো বেঁকে আসা মেরুদণ্ড 
হাতড়াতে থাকে বিশল্যকরণী ভোর

অসংখ্য তুলিকলমের দীর্ঘশ্বাস
আনন্দের সেই রোদ, জ্যোৎস্না 
কী কাজে লাগে, অর্ধেক পৃথিবী
যখন ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়ে লাশের ওপর ! 

অকাল ক্ষয় রোগে কাঁপতে থাকে
পরমায়ুর দ্রাঘিমা বলয়

জ্বিহায় জড়ানো অমৃত যদি ফেরায়
আগামী পৃথিবীর গানে 
তবে আমাদের দেখা হবেই।




৪।।     মাইলফলকের গান
           °°°°°°°°°°°°°°°°°°


বিদ্যাসাগরের পর এই প্রথম কেউ 
মাইলফলক সংখ্যাতত্ত্বের মনোযোগী পাঠক, ঘরছাড়া মরশুমি করোনা বাতাসে 
উড়ে পড়া খড়কুটো, পরিযায়ী শ্রমিক।

প্রেমিকা চাকাও কখনো সখনো ঘাতিনী হলে
বৈশাখ রোদে আধেক পোড়া রাস্তা শরীর, 
সস্তার রক্তে কেমন স্নানে ভিজে যায়। 

এসব দেখতে থাকেন নাতিশীতোষ্ণ পুরের বাসিন্দা
রাজা ও রাজপণ্ডিত। নির্বাচনের পর 
বিধিসম্মত ভাবে চলা ও বলা পালটে নেওয়ার নাম
নাকি রাজনীতি ও গণতন্ত্র ? 

বন্ধুতার যাবতীয় চিরন্তন গন্ধ, বইয়ের পাতায় আটকে থাকাই সম্ভাব্য দহন ? 
কত সহজ ভাবে কুশল বিনিময় ভুলে যায় আমাদের সহযাত্রী পাড়া !




৫।।    অন্তর্ঘাত
          °°°°°°°


ছায়ারা একত্র দাঁড়ালে অভিমানী আলো 
বেছে নেয় মহানিষ্ক্রমণের পথ, 
ছায়া একাকার মানে রাত্রির একাংশ
যে মুছে দেয় চেতনার সমূহ রঙ

প্রশস্ত স্রোতে ভাসমান নুড়িকাঁকর 
সেও এক জীবনের মিথ -----
যার কাছে ইহজন্মের ঋণ বেড়ে গেছে।

সচেতন অবহেলা রাত্রির চেয়ে কম কিছু নয় !
সাজানো অপেক্ষার ভেতর ডানা মেলে 
অনন্যোপায়, অনিবার্য কিছু ঘটে যাওয়ার আগে
কবি ফিরে গেছে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি ফেলে।

আটকাতেই পারতে ভালোবেসে, নিরাময়
হয়ত চাওনি বলে ছায়ার বিষে নীল হয়ে গেছে
একটি আলোর মতো একজন কবি।



অলংকরণ - ইন্দ্রানী পন্ডা

"""'"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

কবিতা

শাপলা পর্ব -৫

কবি প্রতাপ মুখোপাধ্যায় এর কবিতা-





১।।    আফরিন এসো, এসো ভুল করি ।।
           •••••••••••••••••••••••••••••••••



তাকিয়ে থাকা টুকু মেঘের চোখে এঁকে দিয়েছি, বৃষ্টির পায়ে লিখেছিলাম চলে যাওয়া । হারিয়ে যাবে ভাবিনি । ভেবেছিলাম ফিরে আসবে আবার বর্ষায় ।

বৃষ্টিতে স্নান সেরে ফলবতী কলাবউ, শরীর বেয়ে তাঁর জল নেমে আসে, তৃষিত মাটির বুকে এক-এক ফোঁটা, হায়রে তৃষ্ণা ! মেটেনা, বেড়ে যায় ।

এখন সব মুখে মুখোশের ঘ্রাণ, ভয় পাই তুমি যদি এসে ফিরে যাও । তোমাকে ভ্রমিত করে অচেনা আঘ্রাণ । যদি তুমি শোনো ভুল বাতাসের বাণী ।

একবার ভুল করে নুপুর বাজুক । একবার বৃষ্টিতে এসো নেমে পড়ি । আফরিন এসো,  আরও একবার, ভুল করে এসো, এসো ভুল করি ।




২।।     বৈদগ্ধ এবং জন শৌচালয় ।।
          ••••••••••••••••••••••••••••••


বৈদগ্ধ কাঞ্চনজঙ্ঘার নাভির গভীরে লুকিয়ে থাকা আলো । 
আমার এই চড়ুই পাখির জীবন! পায়ে পায়ে কাঁকর,পাথর..
কখনো নুন কখনো বা পান্তার গুপ্ত ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে সূর্য পা ছড়িয়ে বসে, কোনো সুখী কবিতার মনোরম উপমায় ।

জন শৌচালয়ের লাইন শেষ হলে হাতে স্বর্গ নেমে আসে । 
জন শৌচালয়ে দেড়-দুমিনিট শেষ হতে হতে..
এই উপমহাদেশে আরো কিছু বেজন্মার, জন্মের বীজ বপন হয়ে যায় ।
মহান রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রিয় কোষাগারের পশ্চাদটি মেরে নেতিয়ে পরেন, বিষধর নেতার কর্পোরেট শ্যালক ।
মাথামুন্ডুহীন অবোধ্য শব্দের সঙ্গে জন জুড়ে দিয়ে এবং পরে দরদী শব্দটির অশ্লীল সংযোজন ঘটিয়ে, তৃপ্তির উদগার তোলে, আমলা তন্ত্রের কোন শ্বেতবরাহনন্দন ।

শৌচালয়ের আগে জন শব্দটি বসিয়ে, মহান শাসকের বৈদগ্ধ, এবং জনগণের ঔকাত বুঝিয়ে দেওয়া হয় ।




৩।।       নুন-জল ।।
            ••••••••••


পড়িনা কেন জানো ?
পড়া যদি লেখায় চলে আসে ।
পুরাণ আর ইতিহাস, সেতো আমারই অতীত ।
হয়তো আমাকে ছুঁয়ে আছে । 
নতুবা ছুঁয়ে আছি চরাচর ।
মা ছিলেন মায়ের মতো । 
আয়নার সামনে দাঁড়াতেন, সেজে উঠতো
ব্রহ্মান্ড ।
ভগবান কাহিনীতে কথা বলেন, নয়তো করোনায় । 
পিপিই'র ভেতর শুধু নুন-জল বহে যায় ।




৪।।     পার্থ ।।
           •••••


মৃত কর্ণ কৌরব ছিলেন না ।
জীবিত কর্ণও কৌরব ছিলেন না ।
কর্ণ ছিলেন নীল অভিমান ।

রথের চাকা ভেঙে গেলে , হেসে ছিলেন
মেঘপুরুষ, চরাচর নতজানু, মুহুর্মুহু শঙ্খনাদ
বৃষ্ণি সিংহ-বাসুদেব, গীতা অমৃত, আপনি কপট ।

দ্রোহকাল পেরিয়ে এসে, দেখি শুধু মৃত শঙ্খ,
স্তুপিকৃত মলিন কঙ্কাল ।

হাজার পার্থ মৃত, সারথী অমর ।




৫।।     আততায়ী ।।
           ••••••••••


সবাই সশস্ত্র সেদিন এবং সন্ত্রস্ত !

কুম্ভিলা নগরের দোরে দোরে নীল আর হলুদ ভয় আড়ি পেতে ছিল, দেওয়ালের চোখে
কুটিল সন্দেহ, বাতাস বহে চলছিল, মানুষের কান এড়িয়ে, 
সবাই সতর্ক সেদিন এবং সন্দিহান ।

একটি জনপদ হেঁটে চলেছিল, যেন সারিবদ্ধ পিপিলিকা, শৃঙ্খলাপরায়ন । 

জনপদটি ধ্বংসের আগে যে সমবেত গান গেয়েছিল, 
সেই গীতিকার কে খুঁজে চলেছে, আর একটি
ধ্বংসম্মুখ জনপদ ।



অলংকরণ - ইন্দ্রানী পন্ডা

""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""”"""”""""""""""""""""""""""""

কবিতা

শাপলা পর্ব -৫

কবি গৌতম ভট্টাচার্য এর কবিতা -





১।।    ∆ নিঃ স্বার্থ ∆



আজও কলে জল পড়ার শব্দ শুনি
টপটপ করে 
ঝরে পড়ে বকুল ফুল

মাটির মধ্যে শেকড় চারিয়ে গেছে 
অনেক দূর 

ছায়া দীর্ঘ হতে হতে উঠোনে 
এসে পড়ে 
ছায়ার ভেতর নিজেকে খনন করি

পৃথিবী থেকে
 কিছু ফিরে যায়না চাঁদ -সূর্য- আকাশের কাছে




২।।   ∆ অস্তিত্ব ∆



মৃত্যু খোঁজ কেন? রাত পেরোলেই তো ভোর  

দুর্বল পায়ে আঁকড়ে থাকে দেয়াল
শীর্ষ পাখনায়
খুলে নেয় চলৎ শিকার

মৃদু হাওয়ায় দুলুনিতে 
লেখা থাকে অনেক ঝড়ের পরাজয় 

ধূসর শেকড় ধীরে ধীরে সবুজ হয়

মানচিত্র ধরে 
কঠিন পথটাই চলে গেছে আকাশের শেষ সীমানায়




৩।     ∆  চাতক ∆


আগুন জ্বলছে। পা সেঁকছে প্রতিবেশী 
বন্ধ দরজার ভেতর 
পুড়ছে কাঁচা মাংস 
কালের ছদ্মবেশে নৃত্য করে উন্মাদ 

অন্ধকারের ভেতর 
ছলছল করে শিশুদের বিস্মিত চোখ

ঝলসানো পাতা শুঁকে শুঁকে তৃণভোজী
মুখ ফেরায় গুহার দিকে
দুর্বল হাতে চাকা ঘোরায় পৃথিবী 

নদীর কাছে 
"জল দাও জল দাও"বলে কেবলই ডেকে চলে চাতক




৪।।   ∆ দৃশ্য ∆



পুরনো গাভীগুলি চলে বেড়ায়
ঘাসের ভেতর
জিভ ঢুকিয়ে মুছে ফেলে খয়েরি রঙের দাগ

শক্ত খুরের ভেতর যে এত কোমলতা আছে
কোমলতার ভেতর এত শক্তি
ঝুঁকে দেখছে মুগ্ধ আকাশ

তাদের পিঠে খেলা করে সাদা সাদা পাখি 

এক আহত চিত্রকর
সারাদিন আলে বসে এই সব দৃশ্য আঁকেন
তারপর, কাগজগুলো উড়ে যায় মহাশূন্যের দিকে




৫।।    ∆ ফিনিক্স ∆



বৃষ্টি থেমেছে ।নিভে যাওয়ার মতো 
টিমটিম করে জ্বলছে আকাশ
এক একটা নক্ষত্র পেড়ে দিন রাত স্বপ্ন গাঁথেন

আলো ম্লান হয়ে এলে
নক্ষত্রগুলো কালো মেয়ের মাঝে অদৃশ্য হয়

আকাশের জমিতে জেগে ওঠে মরুভূমি স্বপ্নগুলো
ফিনিক্স পাখি হয়ে উড়ে যায়

ঝড় থামলে 
প্রকৃতির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন উদাস




অলংকরণ - শুভদীপ প্রধান

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবিতা

শাপলা পর্ব -৫

 
কবি প্রভাত মিশ্র এর কবিতা -





১।।     খড় ও তুলো
           ----------------


আমার এ শূন্য হাতে উড়ে আসে তোমাদের নিন্দুক তুলো  ।
ভালোবাসি শাদা এ- উত্থান , মনে মনে হেসে ফেলি চালাক-চতুর ।
খেলাগুলি কান পেতে বসে থাকে নদীপারে , কী যে শুধু শোনে ।
এবার ফেরার কথা , হায় এ কাঠের পা নড়ে না চড়ে না ।
সকালবেলার আলো ছুঁয়ে যায় বস্তিতে, ভূতের সমাজে ।
আড়মোড়া ভেঙে বসে একটি বিড়াল , ভয় হয় ---- ভয় বেড়ে যায় ।
বন্ধ হলে জনরব দিকে দিকে বেজে ওঠে অতর্কিত বাঁশি ।
কেশে উঠে ভেবে বসি কেউ কি জানল আমি এইখানে আছি ।
চোখে চোখে জ্বলে ওঠে না-পাওয়ার নীল ফুল , আলো ।
মরে যাই , রেগে ওঠে আমার আঙ্গুলগুলি, মনে মনে বলি :
ভালো হল পৃথিবীতে পশু ও মানুষ মিলে বেঁধে নিল ঘর ।
ছাইস্তূপে জমা হবে সকলের দিনলিপি, বাঁচার পদ্ধতি ।
নিজস্ব পথে বুঝি মিশে গেছে আমাদের আদর্শের ধূলি ।
সকলে কি ভালো আছে --- এ-খবরটুকু জানা এখন জরুরি ।
নিথর গ্রীষ্মরাত , সমাজের সঙ্গীতের স্থায়ী ফিরে এল ।
এমন বিশ্বাস যেন মরা গাছে গাছে ফল, পেকে ঝুলে আছে ।
লৌহযুগের শেষ , মানুষের সংসারে পড়েছে তুষার ।
কোথায় দাঁড়াব  আমি, থেমে গেছি ঘোরতর শরীরের টানে ।
মুঠিবদ্ধ  হয় ধীরে , তুলোর কণিকাগুলি  ছড়ায় নীরবে ।
আকাশ টুকরো হয় , চেয়ে দেখি ওড়ে খড় তুলোর উদ্দেশে ।




২।।    আজ এই রাত
         -------------------


সুখী মানুষের দিকে চোখ মেলে থাকে রাতগুলি ।
একা একা হাসে ।
বৃষ্টির সীমানা ছুঁয়ে আমরা এসেছি বহুদূর ।
ফেরার পথটুকু আরো বেঁকে গেছে ।
পিছনে তাকালে ভয় ।
ও কী রাত্রি ? দু'পায়ে শিকল , ঢেকে আছে সংসারের শব !

বন্ধুরা গিয়েছে চলে অতিদূর অন্ধকার গিলে ---
তাদের মুখের ছিপি শক্ত হ'য়েছে ।
কেউ কেউ চিঠি দেয় , কেউ ব্যঙ্গ করে দেখা হ'লে ।

মাঝে মাঝে তোমার- ই   জন্য আমি আগুপিছু করি ।
এইদিকে ওইদিকে টেনে টেনে আনিও   নিজেকে ।
ঠকিয়ে ফেলে আসি জলকে , কাদাকে ।

মাঝে মাঝে রাতগুলি ভয়ানক হয় ।
ব'সে পড়ি উঁচুতে, নিচুতে ।
ঘুম পায় , ঘুমের দু'পাশে যায় সকাল-বিকেল ।

আজ এই রাত ভয়ানক !




৩।।         ডোরা টুপি
              ---------------


কোন কোন যুবকের ক্রোধ
স্তূপীকৃত রোদ মাঠের কিনারে পড়ে আছে ।
সরকারের প্রতি ক্রোধ , মেয়েদের প্রতি ক্রোধ,
দিন ও রাত্রির প্রতি ক্রোধ
ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাঠে , শস্যের গা-য় ।

কোন কোন যুবকের চোখ রক্ত- তরবারি
বিঁধে যাচ্ছে নদীতে , নালায় ।
গান- ও  গাইছে তারা হাসতে হাসতে
দেশপ্রেমের ।
কোন কোন যুবকের কাঁধে পথবাসিনীর শবদেহ ;
স্বামী ও সন্তান ছিল ভাতের সন্ধানী ...
তারা কি ফিরবে ?

কোন কোন যুবকের মাথার ভিতরে পরিবার,
পরিবারের ভিতরে স্তব্ধ সমাজ , সমাজের ভিতরে ভিতরে
অনাহারী  ,অর্ধাহারী দেশ ।

কোন কোন যুবকের মাথার উপরে হাজতবাসের ডোরা টুপি ,
টুপির ভিতরে গুলির শব্দ , স্বপ্নের ঘুম !




৪।।          আঁচড়
              ----------


মনে তোমার অন্য কথা, মুখটি আরেক জানি
আমার কাছে লুকিয়ে এসে বলল পাতাখানি
পাতার গায়ে ছিদ্র অনেক, অনেক ধুলোবালি
গাছ দাঁড়িয়ে অনেক দূরে --- সারা গায়ে কালি ।
পাতা আমায় বলছে তুমি চান কর নি আজ
তোমার দিকে তাকিয়ে নাকি নোংরা এ- সমাজ
তোমার কানের আশেপাশে উড়তে থাকে কথা
জানি এ-সব , তবুও চাই ভাঙুক নীরবতা ।
জানি এ-সব, তবুও চাই আমার দিকে এসে
তাকাও তুমি দু'চোখ মেলে স্রোতের টানে ভেসে
জীবন যখন স্রোতের , আর জীবন যখন টানের
নেই সেখানে শক্ত হ'য়ে দাঁড়িয়ে থাকার মানে ।
চতুর্দিকে তীব্র ভীষণ সুনীল জলের খেলা
চতুর্দিকে স্রোতের শুরু সকাল-সন্ধ্যাবেলা
তখন তোমার মনের ভিতর অন্য মুখের মাঝে
আমার কথা একটা-আধটা যদি কোথাও বাজে।
পাতা আমায় বলছে তুমি রাত জেগেছে কাল
তোমার দিকে পাতা আছে মস্ত একটা জাল
তুলে নিলাম যত্ন করে ছিন্ন পাতাটিকে
আঁচড় কেটে পাতায় তোমার নামটি রাখি লিখে ।




৫।।      জায়গাবদল
            -----------------


আলোর বসার জায়গা এইখানে, অন্ধকার ওখানে বসবে ।
কিন্তু এরা জায়গাবদল করে নিয়েছে কখন
আমরা দেখি নি । আমরা দেখি নি
যে পাতা রৌদ্রের দিকে মেঘ ঢাকে তার ক্লোরোফিল ।
যে মাঝি সমুদ্রে গেল , তার নৌকার নিচে
অতিকায় তিমি ।
এই তো সেদিন, আমরা যখন কথা বলছিলাম পথে ---
আমাদের আস্তিন নড়ে উঠেছিল ।
আস্তিনের ভিতরে পিস্তল
দেখছিল প্রসন্ন মুখ ---
আমরা দেখেছি, বলি নি কাউকে ,
হেসেছিও কম-বেশি ...
সেই কথা বলা হবে আজ ?



অলংকরণ - শুভদীপ প্রধান

-------------------------------------------------------------------

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

কবিতা

শাপলা পর্ব -৪

কবি তন্ময় মন্ডলের কবিতা -



১।।    অন্ধকারের চোখ



একটা দলাপাকানো কষ্ট পেন্ডুলামের মত দোল খাচ্ছে 
হৃদপিণ্ডের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে।
আলো নিভে আসছে শহরের। 
এগারোটা চল্লিশ। 
শেষ ট্রেন।
আমি উইন্ডো সিটে শূন্যতার উত্তাপ নিচ্ছি। 

আজ নিজের ভেতরটা খুড়বো। 
অতলান্ত গভীর অবধি পৌঁছে দেখতে চাই 
হৃদয়ের অন্ধকার কতটা গাঢ় হলে 
মায়ের মুখ ঝাপসা দেখায়। 
কতটা অন্ধকার আমার নিরপেক্ষ বান্ধবীকে শয়তানের মন্ত্র পড়ায়।

আমি বিষাদের ভাষা শিখিনি, 
শিখিনি মুখ বুজে মেনে নিতে প্রত্নতাত্ত্বিক পাপ।
অন্ধকার খুড়ে খুড়ে তার চোখে আমি চোখ রাখবোই, 
যে চোখ আমাকে আলোর মত করে অন্ধকারের সমীকরণ শেখাতে চায়।




২।।   মিছিলের লেজ



মিছিলের লেজের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছ কখনও?
আমি দেখেছি দিনের পর দিন,  
মাসের পর মাস, 
বছরের পর বছর 
শতশত মিছিলের আলো ধরে এগোনো টলমলে পা...

অবিন্যস্ত সেসব পা আসলে এক একটা গাছ, অথচ
যাদের শিকড়ই নেই।

তবু জীবন আছে,
জীবনধারণের তাগিদ আছে।
বিশ্বাস আছে, তবে দৃঢ় নয়।

এ-গলি থেকে ও-গলিতে যখন হারিয়ে যায় 
একের পর এক মিছিলের লেজ,
আমি বেশ বুঝতে পারি 
বিশ্বাসের সাথে পেটের, 
আর পেটের সাথে মিছিলের কোথাও যেন যোগসূত্র আছে।




৩।।   ঘৃণা 



মদের গ্লাসের তলায় 
যতটুকু আলো আমি চাপা দিয়ে রাখি রোজ, 
তার ভেতরও একটা তুমি আছো। 
যার প্রতি কোনও ক্ষোভ নেই। 
অবিশ্বাস নেই। বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিহিংসা নেই। 

গ্লাসের নীচে আমি চাপা দিয়ে রাখি একটা কোমল আলো। 
তোমার আপেলরঙা মুখ। জলের ফোটা লেগে থাকা কানের লতি।

তাই আমি কখনও মদের গ্লাসের তলায় দেখিনি। পাছে ঘৃণা কমে যায়।




৪।।   একটা তীব্র দহন আর একটা নদীর পাড়



ক্রমশ একা হয়ে পড়ছি আরো।
আমার অভ্যাসের শিকড় থেকে 
তোমাকে উৎখাত করতে পারছি না কিছুতেই।
অথচ গ্রহণ করার উপায়ও যে নেই।

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ, চিৎকার, 
কোলাহলের অন্তরালেও আমি তীব্রতর একাকিত্বে ভুগছি।

তোমায় সমগ্র জাগতিক চেতনা থেকে উপড়ে ফেলার পরও, 
স্মৃতির অন্তরীক্ষ বশে আসছে না কিছুতেই।

তুমি আরও ঘৃণা দাও।
তীব্র আগুনে পুড়িয়ে দাও অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি।

তারপর, 
কেউ আমায় নিয়ে যাক আমার গ্রামে।
কতদিন বেতনী নদীর পাড়ে বসিনি,
যন্ত্রণাদের ঘনীভূত হয়ে নদীতে মিশতে দেখিনি, মরা রোদের গোধূলিতে।

আর কোনও আবদার নেই, চাওয়া নেই।
শুধু এটুকুই...

একটা তীব্র দহন আর একটা নদীর পাড়… 




৫।।   চুমু



আজকাল সময়কে মনে হয় আস্ত পেঁয়াজ।
খোলস ছাড়াতে ছাড়াতে যত ধূসর হয়ে যায় যাবতীয় পাপ, যাবতীয় শোক
ততই অচেনা মানুষ স্পষ্ট হয়,
ফিকে হয় কতশত প্রিয়জন।

সব সম্পর্কেরই মেয়াদ ফুরোয় একদিন।
শিকলগুলো আলগা হয়ে যায় অজান্তেই...

যদিও পৃথিবীতে রাস্তার মতো রাস্তা থাকে, মানুষের মতো মানুষ, চোখের মত চোখ, ঠোঁটের মতো ঠোঁট...

সব ভুলে যাবে জানি,
আমিও ধীরে ধীরে সেলাই করে নেব চার টুকরো হৃদপিণ্ড।

তবু, 
কাউকে গভীরভাবে চুমু খেতে গেলে
তোমায় মনে পড়বে জানি।


অলংকরণ - অতীশ কুন্ডু

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

কবিতা

শাপলা পর্ব -৪

কবি বিন্দুভূষণ দে এর কবিতা -




১।।    ম্যাজিক
         •••••••••

এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর দৃশ্যের 
ভিতর ভিতরে 
আমরা হেঁটে চলেছি অবিরাম 

হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে দিকে দিকে
স্বপ্নের শহর ইতালি, মহাশক্তিধর আমেরিকা, 
মাও সেতুং এর চীন, কবির শহর প্যরিস, নিরোর শহর রোম
স্বজন  হারানো বেদনায় ক্রম মুহ্যমান

এখন আমাদের এখানে বসন্ত কাল 
প্রেমের আদর্শ সময়, 

আমি জানতে চাইছি
সরকার 
মৃত মানুষেরা কোন জাদুবলে পুনরায় জীবিত হয়েছে?




২।।   বলো মেঘ
        •••••••••••


এসো মেঘ
বৃষ্টিকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে এসো
একদিন  
ঘুরে যাও
ভালো লাগবে
লতায় ঘেরানো শ্রমিকের ছোট ছোট  সুনিবিড় বাড়ি 

কেউ তো শুনলই না 
শ্রমিকের শ্রমের গভীরতা

অন্তত তুমি তো স্বীকার করবে
সভ্যতার কথা, 
শ্রমের বিবরণ 
এই ভেবে আনন্দে মালা হাতে দুয়ারেতে
সেই কবে থেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছি ঠায়

বলো মেঘ
এবার কী আমি রাষ্ট্রকে বন্দুক দেখাতে পারি




৩।।    উত্তরাধিকার 
          •••••••••••••


অনেক আগেই আমি বুঝেছিলাম
শিশুর জন্মের সময় 
আর
শরীরের আশ্চর্য আলো নিভে যাওয়ার পর
তীব্র একা 
একাকী প্রবেশ আর শিশুসুলভ আকাশ হাঁটা যায় 

এতদিন যা কিছু আমার বলে 
দাবি করিয়াছি 
বাধাহীন দ্বন্দ্ব হীন শ্রমহীন তাহার মালিক 
এক সুঠাম যুবক 
পুত্র বলে ডেকেছি অতীব স্নেহের বশে

অথচ কী অদ্ভুত তথাগত
আজ এই প্রান্তরে 
মাছি ব্যতীত
আমাদের মৃতদেহের আর কোনো দাবিদার নাই!



৪।।    মা
         •••


এই ঘুম 
রাতের আঁচলে থাকা 
তোমাদের শান্তির ছোট বড় ঘুম 

জানি
একদিন সে নিয়ে যাবে আমাকেও

এইটুকু ভেবে আমি আনন্দে মেতেছি
আমার জন্মের সেই ঘুম 
দ্বন্দ্ব হীন ঈর্ষা হীন শত্রু হীন 
বড় মনোহর বড় অপরুপ বড় লোভনীয়
উৎসবের মেজাজ, আমি মহারাজ
ধরে আছি মায়ের আঙ্গুল



৫।।   সংসার
        ••••••••

এক রাতে উঠে দেখি 
সমুদ্র 
ভালোবাসা দেবে বলে 
নারী হয়ে 
সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে

আমি ভাসি
সে ভাসে
আমি ডুবি
সে ডোবায়
আমি হাসি
সে হাসে
আমি কাঁদি 
সে কাঁদায়

কী দারুণ সংসার হয়ে যায়



অলংকরণ - অমৃতা নায়ক

"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

কবিতা

শাপলা পর্ব -৪

কবি খুকু ভূঞ্যা এর কবিতা-





১।।  পরিক্রমা
        •••••••••


ভাতের হাঁড়িতে জল ঢালার শব্দ
ঘুমোতে গেল রাতের পুরুষ,কাককুইলি স্বপ্ন।
কাঁদালের পাশে সচিবুড়ির বাঁশবন,
সে আজ চৈত্র একাদশী, সে আজ চাঁদ।
ফোঁটা ফোঁটা দুঃখের বড়ি ফুটে উঠেছে শিরা ওঠা কপালের ভাঁজে।
ঘোমটা টেনে বুড়ি দাগ লুকিয়ে হাসছে ‌।

এই নাও আমার উইঢিবির গল্প,নক্ষত্রহীন চোখ,
পাম গাছের মাথায় জ্বলা জোনাকির উত্তাপ,
নিশ্চুপ তুলসীতলা,ঘাস বাগান
দূরে ধানবনে ডাহুকের প্রহর জাগানো গান।

বসে আছি ভাঙা উঠোনে
আহত ঝিঁ ঝিঁ নক্ষত্রের আলোয় সচিবুড়ির ছায়া কাঁপছে--





২।।     মান
          •••••


যদি আসতে পারো আমি ফেরাব না।
সারি সারি গাছ পাহারায়,
জেগে আছে ফুল পাখি প্রজাপতি
আর অগনিত কালো চোখ,
পারবে কি এসব তুচ্ছ করে দরজায় টোকা দিতে?

কী সুন্দর মেঘ করেছে!
ঝিরিঝিরি ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি
ভিজে যাচ্ছে সন্ধ্যামনি পাড়া ‌।

স্নান সেরে বসে আছি, দীপ জ্বলছে টিমটিম
চন্দন গন্ধে ম ম বাতাস
পসরা প্রস্তুত,
আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছি বেদী,
পূজার জন্য হাত বাড়িও না
স্বয়ং পূজা হয়ে যাও নীল পুরুষ--




৩।।    অন্তরাল
          •••••••••


না ফেরা অতিথির মতো নীরব অক্ষর--
ভাঙা কোনো প্রাচীন বাঁশী,
গদ্যের ঘরকন্নায় কৃষিকাজ চাষবাস।
কান খোলা--
অগনিত শ্বাসাঘাতে মাটি চৌচির, ধোঁয়া উড়ছে
কালো পতাকা--
তুমি কি স্বাধীনতা খুঁজছো, না ভাত?
ভাত,নাকি বেঁচে থাকা?
এখন নড়ে না ওঠা কোনো বিস্ময়কর নয়
কাঠ পুড়বে স্বাভাবিক দহনে
থমথমে সকালের ভেতর কেবল জীবনবীজ রক্ষা করা
পোকামাকড়ের হাত থেকে, সতর্কে একা 




৪।।   আঁচল আড়াল
         •••••••••••••••


ভাত চড়ালাম,কাঠ পুড়ছে
এই বসন্তেও এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল,
বাঁশপাতা থেকে টপটপ শব্দ; ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে‌।
কাঁদালের পাশে দাঁড়িয়ে খানিক অন্ধকার দেখলাম
ঠিক যেন তোর থোকা থোকা মনখারাপ
ভিজল কি তোর চোখ?
সেদিকে তাকিয়ে দিশা কি প্রশ্ন করছে
রোজ কি কাঁদতে হয়?
মাটিভাত খেলার পুতুল মেয়ে অত কি আর বোঝে--
হাজার কাজের ফাঁকে চোখ কেন ভিজে যায়?
মা জানে, তুই আর আমি গোপনে গোপনে--




৫।।   চিতা দুপুর
        •••••••••••


ভালোবাসা ফুল নয়, কাঁটার আদরে
 বেড়ে ওঠা খেজুর গাছ।
অথচ চাঁদ ঝুলে থাকে,কতই না ধূপ ধুনো ওড়ে।
সময় মনে রাখে না, মূহূর্তের মিলন ধ্বনি
দূরে নির্মাণ করে ঝলসানো বসন্ত আর মৃত নদীদাগ।

বলেছি তো, এসো বিশ্বাসে বাঁধি মোহনা।
ওই চাঁদ দেখে,
জোসনায় পালক ডুবিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি
যদি কাল ফেরে গোটা একটা রাত নিয়ে ঠোঁটে,
কে বাড়াবে হাত কার দিকে?
কে জ্বালবে দীপ কার চোখে?

বিশ্বাস বীজ দাও
উর্বর বেদনা প্রসারিত বহুদূর--
হে ঋষিপ্রেম,
একটি তপোবন দাও, চিতা দুপুর--



অলংকরণ - সুদীপ্তা মাইতি

"""'"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

কবিতা

বসন্ত বৈষ্ণবী পর্ব-৩ হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়‌ এর কবিতা - ∆ লুকোচুরি  ক্রমশ রাত গভীর হলে অন্ধকারে আমাদের আজন্মের লুকোচুরি শুরু হয়  ...